একদেশে
এক লোক ছিল খুব গরীব। তার বাসের বাড়ীটি ছিল পুরনো জরাজীর্ণ। সে প্রতিদিন পেট পুরে ঠিকমতো খেতেও পেত না । সকালে
উঠে এক টুকরো রুটি খেত আর সারাদিন হাড় ভাঙা কঠিন পরিশ্রম করতো ।
কিন্তু
একটা জিনিস তাকে খুব আনন্দ দিত। এর জন্য তাকে কোন পয়সা-কড়িও খরচ করতে হতো না। তার
বাড়ীর জানালার পিছনের গাছে একটা ছোট্ট টুনটুনি পাখী বাস করতো। সেই টুনটুনি
প্রতিদিন ভোরে মিষ্টি গলায় গান গাইত আর সেই গানের সুরে গরীব লোকটি ঘুম থেকে জেগে
উঠত। আবার সন্ধ্যে বেলায় সেই গানের সুরেই সে ঘুমিয়ে পড়তো । টুনটুনির গান ছিল আসলেই
খুব মধুর আর সুরেলা ।
টুনটুনির
গান শুনতে পেলে লোকটি তার সব দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলে যেতো ।
একদিন
ঘটলো এক অবাক কাণ্ড।
লোকটি
এক চিঠির মাধ্যমে জানতে পেলো, তার এক
দূরসম্পর্কের চাচা মারা গেছেন। সেই চাচা তার জন্য অনেক টাকা-পয়সা রেখে গেছেন। লোকটি জানতো না যে তার কোন চাচা
আছে। তাই সংবাদটি তার জন্য অবাক করার মতোই ছিল।
যাহোক
এই ঘটনা তার জীবন রাতারাতি বদলে দিল।
সে
তার জরাজীর্ণ পর্ণকুটির ছেড়ে শহরে পাহাড়ের উপরে সুন্দর একটি বাড়ী কিনল। পুরনো বাড়ী
থেকে সে কিছুই আনল না। কিন্তু একটা কাজ না করে সে পারলো না। আসার সময় সে তার জানালার
পাশের গাছ থেকে টুনটুনি পাখিটিকে ধরে আনল
এবং একটি নতুন সোনার খাঁচা কিনে তার ভিতরে পাখীটিকে রেখে দিলো।
টুনটুনিকে
লোকটি বলল, “তুমি আগের মতোই গান গেয়ে আমার ঘুম ভাঙাবে আর
রাতে তোমার গান শুনতে শুনতেই আমি ঘুমিয়ে পড়বো। আমার পুরনো জীবনে তুমিই ছিলে সব
চেয়ে বড় সুখ; এখনও তুমিই আমার সব চেয়ে বড় আনন্দ”।
এদিকে
সোনার খাঁচায় বন্দী পাখী নতুন সুরম্য অট্টালিকায় এসে আর গান করে না। সারা দিন মুখ
ভার করে খাঁচার ভিতরে বসে থাকে। লোকটি তাকে এটা দেয়, ওটা দেয়; কিন্তু পাখীটি আর
গান করে না। তখন লোকটি বলে, “ বুঝেছি । খাঁচায় থাকাটা
তোমার পছন্দ হয়নি। ঠিক আছে তুমি খাঁচার বাইরে জানালার ওই কার্নিশে থাকো আর গান
করো। কিন্তু দেখ উড়ে যেও না যেন ”। এরপর সে খাঁচা থেকে
পাখীটিকে ছেড়ে দিলো। পাখীটি সত্যি সত্যি উড়ে গেলো না। কিন্তু সে গানও গাইল না।
সারাদিন জানালার কার্নিশে মন ভার করে বসে থাকে। কিছু খায়ও না , কোথাও যায়ও
না।
টুনটুনির
এমন মন ভার করে থাকা দেখে লোকটিরও মনে খুব দুঃখ হল। এখন তার কত টাকা-পয়সা, কত সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড়, কত
সুস্বাদু খাবার-দাবার তার ঘরে। কিন্তু দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশী যা সে চায়, সে সেই সুখ
পাচ্ছিল না।
অবশেষে
একদিন টুনটুনির কানে কানে সে বলল, “ছোট্ট পাখী,আমি জানি
তুমি কি চাও। তুমি আবার সেই পুরনো বাড়ীতে ফিরে যেতে চাও। আমিও তাই চাই”।
তারপরে
সে পাখীটিকে তার ঘাড়ের উপর বসিয়ে গ্রামের পুরনো বাড়ীর দিকে হাঁটা দিলো।
সারাদিন
হেঁটে হেঁটে লোকটি যখন তার পুরনো বাড়ীতে পৌঁছালো তখন সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। সে তার ঘরে
ঢুকে চৌকির উপর ধপ করে শুয়ে পড়লো । কিছুক্ষণের ভিতরেই তার দু’ চোখের
পাতা প্রায় বুজে এসেছে; এমন সময় জানালার বাইরে গাছের ডালে টুনটুনি তার সেই পুরনো
মিষ্টি গলায় মনের আনন্দে জোরে জোরে গান গাইতে শুরু করলো।
লোকটির
ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।
আর
সে মনে মনে ভাবল,“আমি আসলে বরাবরই ধনী ছিলাম;কিন্তু আমি
তা জানতাম না”।


No comments:
Post a Comment