Tuesday, 29 January 2013

দেশের মায়া, ঘরের মায়া




পলি নামের এক মেরু ভল্লুক ছিল। সে উত্তর মেরুতে তার মায়ের সঙ্গে এক বরফের গুহায় বাস করতো। সে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো আর খেলত। কিন্তু পলি বরফ আর আর্কটিক মহাসাগরের ঠাণ্ডা পানি ছাড়া জীবনে কিছু দেখেনি।
বড় হওয়ার পর পলি ভাবল জীবনে এই বরফ আর ঠাণ্ডা পানি ছাড়া কি আর কিছুই দেখার নাই? সে মাঝে মাঝে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া গাং চিলদের সঙ্গে কথা- বার্তা বলতো। তারা এমন এমন দেশের কথা বলতো যেখানে বরফ নাই; বরং জমিন সবুজ ঘাসে ঢাকা, সাগরের পানি উষ্ণ এবং সাগরের পানিতে অনেক মাছ খেলা করে।


দিনে দিনে পলির মনে ওই রকম দেশে যাওয়ার খুব ইচ্ছে করতে লাগলো।
একদিন তার সঙ্গে এক সামুদ্রিক পাখীর দেখা হল। এই আজব পাখী অন্য গাং চিলের মতো না। পলি তাকে তার স্বপ্নের কথা বলতেই সেই পাখী বলল, তো বেশ তো। এটা কোন ব্যাপার হল? আমি জাদু জানি। তুমি এখনই দেখবে
আর কি তাজ্জব ব্যাপার! পলি দেখতে পেলো পাখীটির সঙ্গে সে এক নতুন দেশে বসে আছে। তার থাবার নীচে গরম বালু। দূরে অনেক খেজুর গাছ। আর সাগরের পানি কি ঘন নীল।
পাখী জিজ্ঞেস করলো- কেমন লাগছে তোমার?”   
পলি বলল, খুবই সুন্দর । কিন্তু এত আলো আর বড় গরম
পাখী এই কথা শুনে তাকে আবার চোখের পলকে আরেক দেশে নিয়ে গেলো।
এই দেশটির মাটি যতদূর চোখ যায় সবুজ ঘাসে মোড়া। মাঠের মধ্যে মধ্যে বেড়া দেওয়া খামারে অনেক ভেড়া-গরু চড়ে বেড়াচ্ছে। পলি ওদের দেখে ভাবল, আহা । ওদের কি কষ্ট! কোথাও ইচ্ছে মতো বেড়াতে পারে না। কিন্তু এই দেশটাও অনেক গরম


সঙ্গে সঙ্গে আজব পাখী তাকে অন্য আরেক দেশে নিয়ে গেলো। এই দেশে অনেক উঁচু উঁচু গাছ। আর পলির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝর্ণা ধারা। কিন্তু বাতাস ঠাণ্ডা আর ভেজা ভেজা। পলি পাখীকে বলল, আমার এই জায়গাও ভালো লাগছে না। এত উঁচু গাছ! যদি আমার ওপর ভেঙে পড়ে
চোখের পলকে আবার পলি নিজের বাড়ীতে ফিরে এলো। সে ঠাণ্ডা বাতাসে বুক ভরে দম নিলো আর থাবা দিয়ে বরফ ঘষতে লাগলো।
আজব পাখী বলল, বন্ধু এখন তুমি নিশ্চয়ই খুশী। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না এতো সুন্দর সুন্দর দেশের একটিও তোমার কেনও ভালো লাগলো না?
পলি এতো দেশ ঘুরে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো । সে শুধু হাসল। উত্তরের আলোর বর্ণালীছটা তার শরীরে এসে পড়লো আর পলি আপন মনে বলল,নিজের দেশই পৃথিবীতে সবচেয়ে সেরা। নিজের ঘরের মতো আপন কোন জায়গা নেই।  এরপর সুখী ভল্লুক ঘুমিয়ে পড়লো।  

Saturday, 26 January 2013

রঙিন মাছ



আমাদের ছোট মাছটির নাম পরী । পরী প্রবাল দ্বীপের পাশে বাস করে। সাগরের পানি ওখানে বেশ গরম আর নীল। পরীর চারপাশে আর অনেক মাছ ঘুরে বেড়ায় । কারও রঙ হলুদ, কারও রঙ কমলা। কারও গায়ে আবার ছোপ ছোপ দাগ, কারও গায়ে ডোরা কাটা দাগ। ওখানে গোলাপি রঙের মাছ আছে, নীল-সবুজ রঙের মাছও আছে।
কিন্তু পরীর গায়ে কোন রঙ নাই, কোন ফোঁটা নাই কিংবা ডোরা কাটা দাগও নাই।
তার অন্যদের মতো সুন্দর ডানা নেই;  সে উড়ন্ত মাছের মত সাগরের পানি থেকে লাফ দিয়ে বাতাসে ভেসে থাকতেও পারে না। তার আসলে চোখে পড়ার মতো কোন বৈশিষ্ট্যই নাই। সে ম্যাট ম্যাটে ধূসর রঙের একটি মাছ। সারাদিন সাগরে ভেসে বেড়ালেও কেউ তাকে দেখে না। এজন্য তার মনে অনেক দুঃখ।
সবাই কি আর চকমকে হয়। তুমি যেমন আছো, তাতেই তুমি সুন্দর বাছা। এটা নিয়ে দুঃখ করো না- পরীর মা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে কথাগুলো বলে।
কিন্তু পরীর মনের দুঃখ যায় না। তার ইচ্ছে সবাই তাকে দেখুক।  তার রঙ, তার গায়ের নকশা দেখে প্রশংসা করুক। এজন্য সে সাগরের নানারকম সবুজ লতা-গুল্ম গায়ে জড়িয়ে রাখে। কিন্তু কেউ তা দেখতে পায় না। বরং লতা-গুল্মের আড়ালে তাকে কেউ আর দেখতেই পায় না।
অনেক সময় অন্য মাছেরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। তাকে ইচ্ছে করে গুঁতো দিয়ে বলে, আহা। দুঃখিত পরী। আমি না তোমাকে দেখতেই পায়নি। আমি তোমাকে এক দলা কাদা মনে করেছিলাম। হি হি হি
একদিন হয়েছে কি? পরী বিকেল বেলা সাগরে কতগুলি পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে ছুটোছুটি করছিলো। আর অকস্মাৎ পাশের পানিতে ভীষণ আছাড়-পিছাড়। পরী কতগুলি সাদা চকচকে ছুড়ির মতো দাঁত দেখতে পেলো । আর দেখতে পেলো লাল মাছ, গোলাপি মাছ, ডোরা কাটা মাছ এবং ফোঁটা কাটা মাছকে গপ করে গিলে ফেললো। তারপর হাঙরটা ধীরে ধীরে সাঁতরে অন্যদিকে চলে গেলো। পরীকে অবশ্য হাঙরটা দেখতেই পায়নি।

পরী ওর লতা-গুল্ম  ঢাকা পাথরের আড়াল থেকে বের হয়ে চারদিকে ফালুক-ফুলুক তাকাল। হাঙরটা আসলেই চলে গিয়েছে। সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আজ সে বুঝতে পেরেছে চকমকে মাছ হওয়া ভালো নাকি ম্যাটম্যাটে সাদামাটা মাছ হওয়া ভালো। তার মাকে এই কথাগুলো বলার জন্য সে আরও জোরে জোরে সাঁতার দিতে থাকলো।   
                                                                                 

Tuesday, 22 January 2013

ইঁদুরের বাড়ী




আমাদের ছোট্ট ইঁদুর ছোট্ট একটা বাড়ীতে বাস করতো। বাড়ীটা সে নিজের হাতে বানিয়েছিল । কৃষকের বাড়ীতে কুমড়োর মাচার নীচে ছোট্ট খোঁড়ল করে সেই বাড়ীতে ইঁদুর থাকতো। বেশ সুখেই তার দিন কাটছিল।
একদিন ইঁদুর বাড়ী থেকে বের হয়ে অনেক দূরে খাবারের সন্ধানে চলে গিয়েছে। অনেক দিন ধরে তার জাম খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল। তাই জামের সন্ধানে বেশ দূরেই চলে গিয়েছিল । এদিকে কৃষক বাড়ীর চারপাশে জঙ্গল- আগাছা পরিস্কার করতে এসে কুমড়োর মাচার নীচে ইঁদুরের বাড়ীও ভেঙে দিলো।
ফিরে এসে ইঁদুর দেখে তার বাড়ী উধাও। তার মন খুব খারাপ হল। বছরের শেষ। আর কদিন পড়েই শীত শুরু হবে। বাড়ী ছাড়া এই শীতে কি ভাবে বাস করবে। ইঁদুর ভেবে কোন কুল-কিনারা করতে পারলো না। অবশেষে ছোট একটা ঝুড়িতে কিছু গম আর ভুট্টার দানা নিয়ে বেচারা নতুন বাড়ীর সন্ধানে বের হয়ে পড়লো।
একটা ইঁদুর খুব ছোট্ট। তার তো আর বড় বাড়ী লাগে না। সে ভাবল তেমন একটা বাড়ী সে খুব সহজেই পেয়ে যাবে। কিন্তু তার ধারণা একেবারেই ভুল। কিছু সময়ের ভিতরেই ইঁদুর বুঝতে পারলো।
কিছুদূর যেতেই তার চোখে পড়লো একটা বড়সড় ফুলের টব।
ফুলের টবটা বসবাসের জন্য মন্দ না- ইঁদুর ভাবল।
এটা আমার বাড়ী- এক মস্ত কলা ব্যাঙ ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করে বলে উঠলো।
এরপর তার চোখে পড়লো একটা গাছের খোঁড়ল।
এই গাছের খোড়লে তো আমি দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারি- ইঁদুর মনে মনে ভেবে এগিএ গেলো।
আমার সঙ্গে থাকতে আসিস না- ডানা ঝাপটে এক হুতুম পেঁচা চীৎকার করে উঠলো।
এরপর তার চোখ গেলো খড়ের গাদার নীচে একটা গর্তের দিকে।
শীতের জন্যও জায়গাটা বেশ আরামের হবে- ইঁদুর ভেবে আনন্দিত হল।
কিন্তু ওখানে ঢুকতে যেতেই এক ধাড়ি ছুঁচো তেড়ে এলো। বলল, এখানে কি চাস? শীগগির ভাগ বলছি
বেচারা ইঁদুর সারাদিন সারারাত পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলো। খিদেয় তার পেট চোঁচোঁ করতে লাগলো। হাতে যা গম আর ভুট্টা ছিল সব শেষ হয়ে গেলো। এদিকে শীতের বাতাস বইতে শুরু করেছে। শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে সে হেঁটে চলল।

সহসা সকাল বেলা সে  হাঁটতে হাঁটতে একটু আনমনা হয়েছে আর ধুপ করে এক গর্তের ভিতর পড়ে গেলো। গর্তের ভিতর পড়েই সে অবাক- ওমা এ দেখি সেই আগের বাড়ীটার মতোই একটা বাড়ী। আর বাড়ীটা বেশ সাজানো গোছানো । তার মানে নিশ্চয়ই কেউ এখানে বাস করে। তারপরে একটু এগুতেই আরেক ইঁদুরের সঙ্গে তার দেখা। ওই বাড়ীতে সে একাই বাস করে। দেখতে আমাদের ছোট্ট ইঁদুরের মতোই ; কিন্তু এটা একটা মেয়ে ইঁদুর।
অবশেষে আমাদের ছোট্ট ইঁদুর একই সঙ্গে তার বাড়ী এবং বউ পেয়ে গেলো। ইঁদুরের বউ ইঁদুরকে খুবই খাতির যত্ন করে বসতে দিলো। বার্গার আর কেক খেতে দিলো। এর পর থেকে দুজন বেশ শুখে-শান্তিতেই দিন কাটাতে লাগলো।
বছর কয়েক পরে সেই ছোট্ট ইঁদুরের বেশ কয়েকটা নাতি-পুতিও হয়েছে। তারা খেলতে গিয়ে আঘাত পেলে কাঁদতে কাঁদতে তার কাছে আসে। সেই ছোট্ট ইঁদুর তখন তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলে, জানিস দাদু আমি আমার বাড়ী হারিয়েছিলাম বলেই না এই বাড়ীটা আর তোর দাদীকে পেয়েছি। কাজেই খারাপ কিছু হলে ভয় পাস নে । ওর ভিতরেই কিছু ভাল লুকিয়ে আছে। মেঘ দেখে তোরা ভয় পাস নে, ওর আড়ালেই সূর্য আছে

Monday, 21 January 2013

লম্বা গাছটি




অনেক অনেক দিন আগে এখান থেকে অনেক অনেক দূরে এক গহীন জঙ্গল ছিল। বড় বড় উঁচু উঁচু গাছে ভরা সেই জঙ্গল। সেই জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে  ছিল সবচেয়ে উঁচু লম্বা এক গাছ। এবং সেই গাছেই জন্মাত পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু ফল।  জঙ্গলের সব পশু-পাখী এই ফল খুব পছন্দ করতো। এই ফলের স্বাদ কিছুটা আমের মতো, আবার কিছুটা আপেলের মতো; কিছুটা কমলার মতো, আবার কিছুটা কলা কিংবা আঙুরের মতো।   রং , গন্ধ এবং স্বাদ মিলিয়ে সে এক অতুলনীয় ফল।
একদিন ছোট্ট এক বানর ওই গাছে চড়ে এই মজার স্বাদের ফল খাচ্ছিল। হঠাৎ তার খেয়াল হল,  আরে একি?  ওই গাছে তো আর মাত্র একটি ফল বাকী। আর সেই ফলটিও আছে একদম মগ ডালে। সে তাড়াতাড়ি অন্যদের এই খবর দেওয়ার জন্য দৌড় দিলো।
ছোট্ট বানরের মা শুনে বলল, “ হুম। তবে তো বিষয়টা খুবই খারাপ। তোমার বাবা আর আমারই ওই ফলটা খাওয়া উচিৎ। তা না হলে অন্য কেউ এটা খেয়ে ফেলবে”।
ছোট্ট ইঁদুর শুনে বলল, “ আসলে এটা আমার খাওয়া উচিৎ। কারণ আমার সঙ্গে আর দশটি ইঁদুর ছানা রয়েছে”।
বাঘ মামা শুনেই তো রেগে গেলো। হালুম করে বলল, “ আমি হলাম এই বনের রাজা। এই গাছের শেষ ফলটা আমি খাবো তাতে এতো কথা কিসের? দেখি তোরা আমাকে কেমন করে ঠেকাস?”
ওদের কথা শুনে টিয়ে খিক খিক করে হেসে উঠলো। বলল, “ বলি তোমরা ওই ফল পাড়বে কেমন করে? বাঘ মামা কি অত উপরে উঠতে পারবে? না। ইঁদুর উঠতে পারবে? না। বানর? হ্যাঁ, বানর কিছুটা গাছে চড়তে পারে কিন্তু ওই মগডালে সে যেতে পারবে না”। টিয়ের কথায় সাঁই দিয়ে বানরও স্বীকার করলো তার পক্ষে অত উপরে ওঠা সম্ভব নয়।
এ কথা শুনে টিয়ে বলল, “ একমাত্র আমার পক্ষেই ওই ফলটা পাড়া সম্ভব। অতএব ওটা আমিই খাবো”।


যেই কথা, সেই কাজ। টিয়ে উড়ে গাছের মগডালে গিয়ে বসলো। তারপর সেই রসাল ফলটাকে তার সূঁচলো এবং ধারালো  ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে পায়ের থাবা দিয়ে ধরল। কিন্তু ফলটা ছিল অনেক বড় আর ভারী। টিয়ে পাখীর ছোট্ট থাবা থেকে ওটা টুপ করে নীচে পড়ে গেলো। নীচে জঙ্গলের সব পশু প্রাণী অবাক হয়ে হা করে দেখছিল। ফলটি তাদের সবার মুখের সামনে দিয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলো।মাটিতে পড়েই ফলটা ফেটে এমন ভাবে  চৌচির হয়ে গেলো যে  আর কারও পক্ষেই তা খাওয়া সম্ভব হল না। 


“হায় হায় একি হল?” বানর চীৎকার করে উঠলো। সবাই খুব দুঃখ পেয়ে যার যার মতো বাড়ী চলে গেলো।
কিন্তু এরপর এক মজার ঘটনা হল। মাটিতে পড়ে ফলটির শত শত বীচি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। কিছুদিন পরে সেই বীচি থেকে অসংখ্য নতুন ফলের গাছের জন্ম হল।
এখন সেইসব  গাছের সুস্বাদু ফল খেয়ে সারা জঙ্গলের পশু-পাখীই তৃপ্ত থাকে।

গানের পাখী





একদেশে এক লোক ছিল খুব গরীব। তার বাসের বাড়ীটি ছিল পুরনো জরাজীর্ণ। সে  প্রতিদিন পেট পুরে ঠিকমতো খেতেও পেত না । সকালে উঠে এক টুকরো রুটি খেত আর সারাদিন হাড় ভাঙা কঠিন পরিশ্রম করতো ।
কিন্তু একটা জিনিস তাকে খুব আনন্দ দিত। এর জন্য তাকে কোন পয়সা-কড়িও খরচ করতে হতো না। তার বাড়ীর জানালার পিছনের গাছে একটা ছোট্ট টুনটুনি পাখী বাস করতো। সেই টুনটুনি প্রতিদিন ভোরে মিষ্টি গলায় গান গাইত আর সেই গানের সুরে গরীব লোকটি ঘুম থেকে জেগে উঠত।  আবার সন্ধ্যে বেলায় সেই গানের  সুরেই সে ঘুমিয়ে পড়তো । টুনটুনির গান ছিল আসলেই খুব মধুর আর সুরেলা ।
টুনটুনির গান শুনতে পেলে লোকটি তার সব দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলে যেতো ।

একদিন ঘটলো এক অবাক কাণ্ড।  
লোকটি এক চিঠির মাধ্যমে জানতে পেলো,  তার এক দূরসম্পর্কের চাচা মারা গেছেন। সেই চাচা তার জন্য অনেক টাকা-পয়সা  রেখে গেছেন। লোকটি জানতো না যে তার কোন চাচা আছে। তাই সংবাদটি তার জন্য অবাক করার মতোই ছিল।


যাহোক এই  ঘটনা তার জীবন রাতারাতি বদলে দিল।
সে তার জরাজীর্ণ পর্ণকুটির ছেড়ে শহরে পাহাড়ের উপরে সুন্দর একটি বাড়ী কিনল। পুরনো বাড়ী থেকে সে কিছুই আনল না। কিন্তু একটা কাজ না করে সে পারলো না। আসার সময় সে তার জানালার পাশের গাছ থেকে টুনটুনি পাখিটিকে ধরে  আনল এবং একটি নতুন সোনার খাঁচা কিনে তার ভিতরে পাখীটিকে রেখে দিলো।
টুনটুনিকে লোকটি বলল, তুমি আগের মতোই গান গেয়ে আমার ঘুম ভাঙাবে আর রাতে তোমার গান শুনতে শুনতেই আমি ঘুমিয়ে পড়বো। আমার পুরনো জীবনে তুমিই ছিলে সব চেয়ে বড় সুখ; এখনও তুমিই আমার সব চেয়ে বড় আনন্দ

এদিকে সোনার খাঁচায় বন্দী পাখী নতুন সুরম্য অট্টালিকায় এসে আর গান করে না। সারা দিন মুখ ভার করে খাঁচার ভিতরে বসে থাকে। লোকটি তাকে এটা দেয়, ওটা দেয়; কিন্তু পাখীটি আর গান করে না। তখন লোকটি বলে, বুঝেছি । খাঁচায় থাকাটা তোমার পছন্দ হয়নি। ঠিক আছে তুমি খাঁচার বাইরে জানালার ওই কার্নিশে থাকো আর গান করো। কিন্তু দেখ উড়ে যেও না যেন । এরপর সে খাঁচা থেকে পাখীটিকে ছেড়ে দিলো। পাখীটি সত্যি সত্যি উড়ে গেলো না। কিন্তু সে গানও গাইল না। সারাদিন জানালার কার্নিশে মন ভার করে বসে থাকে। কিছু খায়ও না , কোথাও যায়ও না। 

টুনটুনির এমন মন ভার করে থাকা দেখে লোকটিরও মনে খুব দুঃখ হল। এখন তার কত  টাকা-পয়সা, কত সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড়, কত সুস্বাদু খাবার-দাবার তার ঘরে। কিন্তু দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশী যা সে চায়, সে সেই সুখ পাচ্ছিল না।
অবশেষে একদিন টুনটুনির কানে কানে সে বলল, ছোট্ট পাখী,আমি জানি তুমি কি চাও। তুমি আবার সেই পুরনো বাড়ীতে ফিরে যেতে চাও। আমিও তাই চাই
তারপরে সে পাখীটিকে তার ঘাড়ের উপর বসিয়ে গ্রামের পুরনো বাড়ীর দিকে হাঁটা দিলো।
সারাদিন হেঁটে হেঁটে লোকটি যখন তার পুরনো বাড়ীতে  পৌঁছালো তখন সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। সে তার ঘরে ঢুকে চৌকির উপর ধপ করে শুয়ে পড়লো । কিছুক্ষণের ভিতরেই তার দুচোখের পাতা প্রায় বুজে এসেছে; এমন সময় জানালার বাইরে গাছের ডালে টুনটুনি তার সেই পুরনো মিষ্টি গলায় মনের আনন্দে জোরে জোরে গান গাইতে শুরু করলো।
লোকটির ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। 
আর সে মনে মনে ভাবল,আমি আসলে বরাবরই ধনী ছিলাম;কিন্তু আমি তা জানতাম না। 

কে সবচেয়ে সুন্দর?





দিগন্ত জোড়া সবুজ মাঠ, কুল কুল বয়ে যাওয়া ছোট নদী আর ছায়া ঘেরা গ্রাম পেরিয়ে দূরে যে ঘন জঙ্গল দেখা যায় ওখানে বাস করে অনেক পাখী । তাদের মধ্যে অনেক বন্ধুত্ব। সবাই মিলেমিশে ওই জঙ্গলে থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ওরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে । সারাদিন পরে সূর্য ডুবার সময় নীড়ে ফিরে আসে। রাতে আরাম করে ঘুমায়। এভাবেই চলছিল ।
একদিন সকাল বেলা ময়ূর তার সুন্দর রঙিন পেখম মেলে নাচ ছিল। হঠাৎ সে লম্বা এক দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল ।
পাশ দিয়ে বানর তখন কলা গাছের দিকে যাচ্ছিল । সে জিজ্ঞেস করলো, “ কি ব্যাপার? এতো লম্বা শ্বাস ছাড়ছ যে ভারী?”
ময়ূর ধীরে ধীরে বলল, “ না তেমন কিছু না। আমার লেজ দেখে ভাবছি এটা কত সুন্দর  রঙিন!”
“কি? তাই নাকি? কিন্তু ওটা তো আমার লেজের মত সুন্দর না । আমার দিকে তাকিয়ে দেখ । লাল, হলুদ, সবুজ, নীল- কি রঙের বাহার! আর তোমার পেখমের চেয়ে কত উজ্জ্বল”। মাথার ওপরের ডালে বসে থাকা টিয়ে পাখী বলে উঠল।
“দেখ কত অহংকার । কিন্তু আমার সফেদ সাদা পালক তোমাদের চেয়ে অনেক সুন্দর”। পাশের আরেক গাছের ডালে বসে থাকা ঘুঘু চিকন সুরে বলল।
এভাবে পাখীরা সারাদিন এবং সারারাত ঝগড়া করতে থাকল। রাতের জঙ্গলে আর কোন পশু-পাখি ঘুমোতে পারলো না। এতে সবাই খুব বিরক্ত হল।
পরের দিন সকাল বেলা। পাখীরা  তখনও ঝগড়া করছে। কিন্তু পুরো জঙ্গলে সুনসান নীরবতা। কি ব্যাপার? জঙ্গলের রাজা বাঘ মামা আসছে। পাখীদের কিচির-মিচির ঝগড়ার কারণে রাতে বাঘ মামার ভাল ঘুম হয়নি। তাই সকাল সকাল নিজেই দেখতে এসেছে ব্যাপারটা কি?
বাঘ মামা পাখীদের কাছে এসে হুঙ্কার দিয়ে বলল, “ হালুম। ঘটনা তাহলে এটাই । তো বেশ তো। আমি এই বনের রাজা। তোদের মধ্যে যে সবচেয়ে সুন্দর তাকে দিয়েই তো আমি আজকের সকালের নাস্তা করবো। তোরা এখন তাড়াতাড়ি বল, কে সবচেয়ে  সুন্দর? এ প্রতিযোগিতায় যে বিজয়ী আমি তাকেই খাব”।
বাঘ মামার কথা শুনে সব পাখী তো চুপ। কারও মুখে আর রা নেই।
বাঘ মামা আবার হুঙ্কার দিতেই ময়ূর বলে উঠল, “ আসলে হয়েছে কিনা আমার অনেক পালকের রঙ জ্বলে গিয়েছে”।
টিয়ে বলল, “ আমার পা দুটো একেবারেই সুন্দর না”।
ঘুঘু বিড়বিড় করে বলল, “আমি খুবই সরল-সহজ একটা পাখী”।
“হুম। তা হলে আর তোরা ঝগড়া করিস না”। বলেই বাঘ মামা গড় গড় করতে করতে জঙ্গলের ভিতরে চলে গেল।
তারপর থেকে পাখীরা আর কখনও ঝগড়াঝাঁটি করে না। 

কচ্ছপের বিশ্ব ভ্রমণ





অবশেষে তুতু কচ্ছপ বিশ্ব ভ্রমণে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল। ওর কথা শুনে পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধব সবাই তো হেসেই খুন।
বাবা কচ্ছপ বললেন, তুতু পাগলামি করো না। আমি শুনেছি দুনিয়াটা অনেক বড়। তুমি ছোট বাচ্চা। তুমি এটা পারবে না
তুতুর ছোট বোন বলল, তুমি তো আমার মত সাঁতার দিতেও পার না
তুতুর দাদা বললেন, বোকামি করিস না দাদু
কিন্তু তুতুর এক কথা। দুনিয়াটা এবার নিজেই ঘুরে দেখবে।
অতএব একদিন সকাল বেলা বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবারের সবাইকে বিদায় জানিয়ে তুতু সাগরে ঝাঁপ দিল।
কিন্তু সাগরে সাঁতার দিয়ে তুতু কিছু দূর যেতে না যেতেই খুব ক্লান্ত হয়ে গেল।
ওখান থেকে সে তার মা এবং বোনকে দেখতে পাচ্ছিল । ওরা সাগর পারে খেলা করছে। তার মনে হল এভাবে বিশ্ব ভ্রমণে বের হয়ে কাজটা ভাল হয়নি। কিন্তু এখন ফিরে গেলে সবাই কি বলবে? তাই তুতু সাঁতার দিতেই থাকলো ।

ঘণ্টা দুয়েক সাঁতরানোর পড়ে তুতু সত্যিই আর পারছিল না। মনে হচ্ছিল ওর পাখনা খুলে যাচ্ছে । সে খুব ভাল ভাবেই টের পাচ্ছিল এখন আর তার পক্ষে সাঁতরে তীরে ফেরাও সম্ভব না।
আমি আসলেই একটা বোকা । এভাবে বের হয়ে কি ভুলটাই না করেছি! মনে মনে ভাবল তুতু। এর পর আর তার কিছু মাথাই আসছিল না। সাগরের গভীর পানিতে সে তলিয়ে যেতে শুরু করলো।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ তুতু ভুস করে ভেসে উঠলো । কে যেন সাগরের  ভিতর থেকে তাকে  পানির উপর বাতাসে ছুঁড়ে দিয়েছে। তুতু আবার সূর্যের সোনালী আলো দেখতে পেল এবং একটু পরেই একটা তিমি মাছের পিঠের ওপর ধপ করে পড়ে গেল।
আহা বাছা তোমার ব্যথা লেগেছে কি? তোমাকে আবার পানিতে নামিয়ে দেব কি? তিমি মাছ খুব মিষ্টি স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করলো।
না । না । আমি তো ডুবতে বসেছিলাম। তুমি তো আমায় প্রাণে বাঁচালে- তুতু হাঁপাতে হাঁপাতে তিমিকে বলল। এর পর সে  তিমি মাছকে তার সব কাহিনী শোনাল ।
এ আর এমন কি বিষয় ! আমি তো মাঝে মাঝে দুনিয়াটা ঘুরেফিরে দেখি। তুমি যাবে আমার পিঠে ? তিমি মাছ তুতুকে শুধাল।
তুতুর তো আনন্দে দম যায় যায়। তবে তার স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে?  
অতঃপর তিমি মাছের পিঠে চেপে তুতুর  বিশ্ব ভ্রমণ শুরু হল। অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে তুতুর সময়টা কেটে গেল। এই সাগর থেকে সেই সাগর-মহাসাগর পেরিয়ে পাক্কা এক বছর পরে তুতু বাড়ীর পাশে সাগর তীরে এসে নামলো ।
বাড়ীর সবাই তো ওকে দেখে মহাখুশী।
আমার হাঁস ছানাটা ফিরেছে? বাবা কচ্ছপ চিৎকার করে উঠলেন।
সোনামণি কাজটা কি খুব  কঠিন? খুব কষ্ট হয়েছে বাছা? মা কচ্ছপ বুকে টেনে তুতুকে আদর করে জিজ্ঞেস করলেন।
তুতু শুধু মিটিমিটি হাসল । 
বলল, মোটেও না। আমার বন্ধু তিমি ছিল না